সাম্প্রতিক সময়ে ২রা ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম আল-জাজিরা চ্যানেলে All The Prime Minister’s Men নামক একটি তথ্যানুসন্ধানী রিপাের্ট জনমনে ব্যাপক আলােচনা ও সমালােচনার ঝড় তুলেছে। বিশেষত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান সেনাপ্রধানের পরিবারকে জড়িয়ে রিপাের্টটি উপস্থাপন করা হয়। যা নিয়ে চলছে তীব্র বিতর্ক।

রিপাের্টটিতে আমরা যা দেখেছি তার সাথে বাস্তবতার কতটুকু মিল রয়েছে ? কেন এই ষড়যন্ত্রমূলক বা উদ্দেশ্যপ্রনােদিত
প্রচারনা ? জনমনের নানা জল্পনা-কল্পনা এবং প্রশ্ন নিয়ে আমাদের মুখােমুখি আহমেদ পরিবারের একজন
সদস্য-

প্রশ্নঃ আপনাদের পরিবারকে জড়িয়ে আল-জাজিরা যে সংবাদটি প্রকাশ করেছে সেখানে তারা আপনাদের
পরিবারকে একটি মাফিয়া পরিবার হিসেবে আখ্যায়িত করতে চেয়েছে, এর ভিত্তি কতটুকু? আপনার পরিবার
সম্পর্কে বলুন।

আনিস আহমেদঃ
আপনারা সকলে অবগত আছেন সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম আল-জাজিরায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী শেখ হাসিনা এবং সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এর পরিবারকে জড়িয়ে একটি
উদ্দেশ্যপ্রনােদিত তথ্যচিত্র প্রকাশিত হয়েছে। সেনাপ্রধান ও আমার পরিবারের বিরুদ্ধে প্রকাশিত তথ্যচিত্রটিতে আমাদের
পরিবারকে মাফিয়া পরিবার হিসেবে পরিচিত করার একটি ঘৃণ্য অপপ্রয়াস চালানাে হয়েছে। আমার পরিবারের ব্যাপারে অপপ্রচার বা ঘৃণ্য অপচেষ্টার কথা বলছি এই কারনে – আপনি জানতে চেয়েছেন আমার পরিবার সম্পর্কে।

আমাদের আট ভাই-বােনের মধ্যে বড় বােন ফাতেমা ইসলাম এর স্বামী মােঃ নূরুল ইসলাম পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপপরিচালক হিসাবে অবসর গ্রহন করেন। তাদের একমাত্র কন্যা সন্তান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা থেকে চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড নিয়ে এমবিএ সম্পন্ন করে এবং লন্ডনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বর্তমানে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব
প্রফেশনালস এ লেকচারার হিসাবে কর্মরত আছে।

আমি আলহাজ্ব মােঃ আনিস, আহমেদ পরিবারের ২য় সন্তান, শিক্ষাজীবন শেষ করে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন
সময়ে ইরান, সিঙ্গাপুর এবং সৌদি আরবের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রজেক্ট কর্মকর্তা হিসাবে কর্মরত ছিলাম। ১৯৮৯ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ১ম শ্রেণীর একজন ঠিকাদার হিসেবে আমি পি,ডব্লিউ,ডি, রাজউক, ঢাকা সিটি কর্পোরেশন, সড়ক ও জনপদ বিভাগ, ফ্যাসেলিটিজ তথা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট বাের্ড এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এমইএস এ সুনামের সাথে বহু নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করি। ২০০৫ সালে ঠিকাদারী ব্যবসা থেকে অবসর গ্রহন করে ২০০৭ সাল থেকে স্থায়ীভাবে মালয়শিয়াতে বসবাস করে আসছি। আমার একমাত্র ছেলে আসিফ আহমেদ দারজিলিং ‘রক বেল্ট স্কুল থেকে এ লেভেল এবং ২০০৫ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ পাশ করে। বর্তমানে আমার ছেলে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন মােহাম্মদপুর এর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হিসেবে জনগণের সেবায় নিয়োজিত আছে। আমার একমাত্র মেয়ে আবিদা মুরসালাত মালয়শিয়া ব্রিকফিল্ড ল কলেজ এর ৩য় বর্ষের ছাত্রী হিসাবে পড়াশোনা করছে।

আমার ২য় ভাই জেনারেল আজিজ আহমেদ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান। তিনি প্রথম সারির ক্যাডেট হিসাবে ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ মিলিটারী একাডেমী চট্টগ্রাম থেকে সেনাবাহিনীর আটিলারী রেজিমেন্টে কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে কর্মজীবন শুরু করেন এবং তার বর্ণাঢ্য কর্মজীবন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। তাঁর বড় ছেলে ইরফান আহমেদ সাদিৰ ষ্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে কর্মরত, ২য় ছেলে ইশফাক আহমেদ সাকিব বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পদে চাকুরীরত এবং ৩য় ছেলে ইশরাক আহমেদ সাদিন ইন্টারন্যাশনাল টার্কিশ হােপ স্কুল থেকে ও লেভেল শেষ করে এ লেভেলের ছাত্র হিসেবে পড়াশােনা করছে।

আমার ৩ ভাই মােহাম্মদ হাসান ওরফে হারিস আহমেদের একমাত্র মেয়ে যারিন তাসনিম এআইইউবি হতে বিএসসি এবং
এমবিএ পাশ করে ইউনিভার্সিটি অব মালয়াতে ডাটা সাইন্স বিষয়ে এমএসসিতে পড়াশােনা করছে। এছাড়াও সে একটি ব্যাংকে প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে কর্মরত আছে।

আমার ৪র্থ ভাই মরহুম সাঈদ আহমেদ টিপুর একমাত্র ছেলে লন্ডন থেকে কম্পিউটার সাইন্স বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রী সম্পন্ন
করে বর্তমানে নিউজিল্যান্ডে পড়াশােনা করছে।

আমার ২য় বােন শামীমা আক্তার এমএ এবং এমবিএ শেষ করে একটি স্বনামধন্য ব্যাংকে সহকারী ম্যানেজার হিসাবে কর্মরত
এবং তার একমাত্র মেয়ে ইফফাত তাসনিম আর্মড ফোর্সেস মেডিক্যাল কলেজের ৩য় বর্ষের ছাত্রী হিসাবে অধ্যয়নরত রয়েছে।

আমার ৫ম ভাই তােফায়েল আহমেদ জোসেফ ছাত্র জীবনে মােহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিল। বর্তমানে সে
বিবাহিত এবং এক সন্তানের জনক।

এছাড়া ৩য় বােন সালমা আক্তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে বিবিএ এবং এমবিএ পাশ করে আমেরিকান নাগরিক
হিসাবে বর্তমানে নিউইয়কে তার কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার স্বামী, এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে।

এই হচ্ছে আমাদের পরিবারের সকল সদস্যের Background বা পরিচিত, যাই বলেন আপনি।

প্রশ্নঃ পরিবারের পরিচিতি শুনে অনেকটাই বিমােহিত হলাম। এরকম একটি পরিবারকে কেন মাফিয়া বা দূর্নীতিবাজ
হিসেবে আখ্যায়িত করার চেষ্টা তা বােধগম্য নয়। আপনাদের পরিবারের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে বলুন।

রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বিষয়ক তথ্য

আনিস আহমেদঃ আমাদের পরিবার তথা আহমেদ পরিবার ঢাকার মােহাম্মদপুর থানার স্থায়ী বাসিন্দা ও পরিবারের চারজন সন্তানই স্থানীয় আওয়ামীলীগ রাজনীতির সাথে গত ৮০ এর দশক থেকে সক্রিয় ভাবে জড়িত আছি আমি জাতীয় সংসদ নির্বাচন – ১৯৯৬ এ আওয়ামীলীগের মনােনীত প্রার্থী হিসেবে মােহাম্মদপুর ধানমন্ডি তথা ঢাকা-৯ আসনে নির্বাচন করার জন্য মনােনয়ন প্রত্যাশী ছিলাম আমি ২০০৭ সালে মালয়েশিয়া গিয়ে নিবন্ধনকৃত লিমিটেড কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করে ব্যবসা বাণিজ্যের মাধ্যমে উপার্জিত টাকায় কুয়ালালামপুরে বাড়ী ক্রয় করে পরিবার পরিজন নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছি। আমি ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত বিদেশে চাকুরী এবং পরবর্তীতে দেশে সুনামের সাথে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ব্যবসা করেছি। ব্যবসার টাকা
খাটিয়ে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে আমার ক্রয়কৃত জমিগুলােতে ডেভেলপারের নির্মানরত বিল্ডিংগুলাে থেকে আমি সর্বমােট ২০টি
ফ্ল্যাট পাই। ইতিপূর্বে বিদেশে উপার্জিত অর্থে ১৯৮৮ সালে মােহাম্মদপুর নূরজাহান রােডে আমার পিতার নামে একটি দোতালা বাড়ী ক্রয় করি এবং উক্ত বাড়ীটি সংস্কার করে ৬ তলা বিল্ডিং নির্মান করি। উক্ত ফ্ল্যাট সমূহ থেকে আমার পরিবার উল্লেখযােগ্য পরিমানে ভাড়া প্রাপ্ত হয়ে থাকে। তাছাড়া এখনও মােহাম্মদপুর ও আদাবর থানার অন্তর্গত হাউজিং এ আমার এবং আমার পরিবারের সদস্যদের সৎ উপায়ে অর্জিত অর্থে ক্রয়কৃত জমি ও প্লট রয়েছে।

আমার সেজো ভাই জনাব মােহাম্মদ হাসান ওরফে হারিস ৯০ এর দশক থেকেই একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী তিনি ৮০-৯০ এর
দশক থেকে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন। তিনি ঢাকা মহানগর
যুবলীগের ১নং সদস্য ছিলেন। তিনি মােহাম্মদপুর থানা ৩১ নং ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি ছিলেন। তিনি ১৯৯০ সালে
মােহাম্মদপুর থানার আওয়ামীলীগ মনােনীত ৩১ নং ওয়ার্ডের কমিশনার পদপ্রার্থী ছিলেন। আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে মােঃ
হাসান ওরফে হারীসের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে; ৯০ দশকের তৎকালীন আওয়ামীলীগের সিনিয়র নেত্রীবৃন্দ যা এখনাে অকপটে স্মরণ করেন। যিনি কখনই কোন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িত ছিলেন না। রাজনৈতিক কারণে বারবার তিনি কথিত ফ্রিডম পাট ও বিএনপি-জামায়াতের প্রতিহিংসার স্বীকার হয়েছেন। নিরাপত্তা ও প্রাননাশের হুমকি থাকায় মােহাম্মদ হাসান ওরফে হারিস ২০০৫ সালে বিদেশ চলে যায় এবং পরবর্তীতে হাঙ্গেরীতে স্থায়ী হন। হাঙ্গেরীতে স্থায়ী রেসিডেন্স পারমিট’ প্রাপ্ত হয়ে সে বসবাস করছে এবং নিজের ব্যবসা চলমান রাখছে।

আমার ৪র্থ ভাই জনাব সাইদ আহমেদ টিপু যিনি মােহাম্মদপুর কমার্শিয়াল কলেজের ভিপি ছিলেন। এক কথায় তিনি মােহাম্মদপুর থানা আওয়ামীলীগের অন্যতম প্রধান সংগঠক ছিলেন। রাজনীতিতে টিপুর মতাে শান্ত মেধাবী নেতা বিরল। যিনি একসময় ঢাকার আওয়ামীলীগের ছাত্র রাজনীতির পথিকৃত ছিলেন। আজও তার তৎকালীন রাজনৈতিক সহকর্মীরা স্বশ্রদ্ধচিত্তে তাকে স্মরণ করেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ১৯৯৭ সালে ফ্রিডম পার্টির ইমন বাহিনীর সদ্রাসীরা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে যার বিচার আমরা আজও পাইনি।

আমার ছােট ভাই তােফায়েল আহমেদ জোসেফ ৯০ এর দশক থেকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি
মােহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। অত্যন্ত মেধাবী সদালাপি তােফায়েল আহমেদ জোসেফের নেতৃত্ব ও ছাত্রলীগের রাজনীতিতে তার উত্তরণে ঈর্ষানীত হয়ে তৎকালিন ফ্রিডম পাটি ও জামায়াত বিএনপি’র প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়। তাকে ঘায়েল করতে তৎকালীন বিএনপি জামায়াত পন্থী সংবাদপত্রগুলাে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে প্রচার প্রচারণা শুরু করে। এক পর্যায়ে ফ্রিডম পার্টির নেতা মােস্তফা হত্যায় আসামী করে ১৯৯৭ সালে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং ২০ বছর কারাবাস করতে হয়। পরবর্তীতে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমার আওতায় তিনি মুক্তি লাভ করেন।

পাঠকদের কাছে আপনার মাধ্যমে আরও বলতে চাই, ৮০ ও ৯০ দশকের রাজনৈতিক নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েও আমি ও আমার ভাইয়েরা স্বাধীনতার স্বপক্ষের বাংলাদেশ আওয়ামী রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম, যার দরুন আমাদের পরিবার তৎকালীন সময়ে বরাবরই একটি স্বার্থান্বেষী মহলের চক্ষুশূল ছিল; যার বাস্তব প্রমান ১৯৯৬ সালের বিতর্কিত মােস্তফা হত্যা মামলার আসামী হিসেবে আমি ও আমার দুই ভাইকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রনােদিতভাবে আসামী করা হয়েছিল।

প্রশ্নঃ আল-জাজিরা চ্যানেলে প্রকাশিত সংবাদে আপনাকে ও আপনার ভাইদেরকে মােস্তফা হত্যার খুনি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, এই যে মােস্তফা যাকে এই প্রজন্মের অধিকাংশই চেনেনা বা মােস্তফা সম্পর্কে জানে না, আপনি কি আমাদেরকে বলবেন কে এই মােস্তফা, কি তার পরিচয়, আর কেনইবা আপনাদেরকে তার খুনি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে ?

মােস্তফা ওরফে ফ্রিডম মােস্তফার পরিচিতি

আনিস আহমেদঃ প্রথমেই আমি জানাচ্ছি, মােস্তফা ছিল ফ্রিডম পার্টির ধানমন্ডি থানার প্রধান সমন্বয়ক। এছাড়াও তৎকালীন সময়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে মিরপুর-মােহাম্মদপুরের বিভিন্ন হত্যা, চাঁদাবাজি, ভূমি দখলদ্বারী এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টা মামলার চার্জশীটভূক্ত পলাতক আসামী ছিল এই ফ্রিডম মােস্তফা। বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িতে গােলাগুলি ও বােমা হামলায় ধানমন্ডি থানায় (মালমা নং ২৪ তারিখ ১৮ আগষ্ট ১৯৮৯) ধারা ১৪৩/৩৪ দন্ডবিধি ৩/৪ বিস্ফোরক মামলার চার্জশীটভূক্ত পলাতক আসামী ছিল ফ্রিডম মােস্তফা ওরফে চিটার মােস্তফা। ১৯৮৯ সালে এই মােস্তফা এবং তার সঙ্গীরা মিলেই বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যা করার জন্য ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে হামলা চালিয়েছিল।

মােস্তফা হত্যা ছিল ফ্রিডম পার্টির অন্তঃ দ্বন্দের ফল ও রাজনৈতিক ফায়দা লুটার অপচেষ্টাঃ

সত্যিকথা বলতে, মােস্তফা হত্যা ছিল ফ্রিডম পাটির অন্তঃ দ্বন্দের ফল ও তৎকালীন সময়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটার অপচেষ্টা।
যেহেতু আগেই আমি আপনাদেরকে আমাদের পরিবারের আওয়ামী রাজনীতির জড়িত ব্যাপারটি বলেছি। ১৯৯৬ সালের ৫ই মে লালমাটিয়াস্থ সিডিএস প্রেসের ভিতরে ফ্রিডম পার্টির অন্তঃদ্বন্দ গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছিল মােস্তফা। আহত হবার দুইদিন বিলম্বে মামলা দায়ের করার কারন উল্লেখ করে মােস্তফার স্ত্রী রাশিদা পারভিনকে প্ররােচিত করে মােস্তফার ভাই হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজান, যিনি মােহাম্মদপুর ৩২ নং ওয়ার্ডের প্রাক্তন কমিশনার ছিলেন। পাগলা মিজান এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য আমার ও আমার দুই ভাই হারিস ও জোসেফকে আসামী করে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বশে মামলা দায়ের করে।

গুলিবিদ্ধ হওয়ার প্রায় ৯ দিন পর ১৬ মে ১৯৯৬ তারিখ ম্যাজিষ্ট্রেট এর নিকট ঢাকা মেডিকেলের ৩১ নং ওয়ার্ডে ভিকটিম মােস্তফাকে দিয়ে Dying Declaration রেকর্ড করানাে হয় এবং এর বেশকিছু দিন পর মােস্তফা মৃত্যুবরণ করে। পরবর্তীতে মামলাটি ধার ৩০২ এ পরিণত করে আমাদের ৩ ভাই সহ আরাে কয়েক জনের বিরুদ্ধে চার্জশীট প্রদান করে ঢাকা মহানগর ২
দায়ারা জজ আদালতে মামলার বিচার কার্য শুরু করা হয়। বিচারাধীন মামলার এক পর্যায়ে তৎকালীন বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের নির্দেশে মামলাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মামলা দেখিয়ে ঢাকা মহানগর ২য় দায়রা জজ আদালত থেকে ঢাকা দ্রুত বিচার আদালত-৩ এ স্থানান্তর করা হয়।

পরবর্তীতে ৯০ দিনের মধ্যে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার সুস্পষ্ট বিধি থাকা সত্ত্বেও, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচার কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হওয়ায় মামলাটি পূর্ববর্তী আদালতে ফেরত না পাঠিয়ে আইন বহির্ভূতভাবে ৯০ দিনের অতিরিক্ত সময় প্রহণ করে। উক্ত সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজ এর ৩১ নং ওয়ার্ডের কর্তব্যরত চিকিৎসক এবং Dying Declaration এর অন্যতম স্বাক্ষী ডাক্তার
আনােয়ারের স্বাক্ষী গ্রহন না করেই Toying I Declaration রেকর্ড করা হয়।

পরবর্তীতে মােস্তফা হত্যা মামলায় হাই কোর্ট থেকে আমি স্থায়ীভাবে জামিনে থাকাকালীন উদ্দেশ্যমূলকভাবে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ট্যাংক চালক সুবেদার মােসলেম উদ্দিন হিসেবে আমাকে সিআইডি দিয়ে গ্রেফতার করিয়ে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে জেলে পাঠানাে হয়েছিল। তদন্ত রিপােটে আমি সুবেদার মােসলেম উদ্দিন নই এই মর্মে চুড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ায় জেল থেকে বেকসুর মুক্তি পাই। এদিকে আমার ভাই মােহাম্মদ হাসান ওরফে হারিস এবং জোসেফ’কে উদ্দেশ্যমূলকভাবে শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসাবে আখ্যায়িত করার হীণ যড়যন্ত্র অব্যাহত থাকে। রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনের ফৌজদারী কার্যবিধি ৪০১ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার কর্তৃক মার্চ ২০১৯ তারিখ মহামান্য রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ফ্রিডম পার্টির মােস্তফা হত্যার বিতর্কিত মামলায় যাবতজীবন কারাদণ্ড ও অর্থদন্ড থেকে আমাকে এবং আমার ভাই মােহাম্মদ হাসান ওরফে হারিসকে দায়মুক্তি প্রদান করা হয়। তখন থেকে আমি, আমার ভাই হারিস এবং জোসেফ মুক্ত ও স্বাধীন নাগরিক হিসাবে নিজ মাতৃভূমি বাংলাদেশে যাতায়াত ও বসবাস করে আসছি।

প্রশ্নঃ আল-জাজিরা টেলিভিশনে আরও একটি বিষয় উত্থাপিত হয়েছে যে, আপনার ভাইয়ের প্রভাব খাটিয়ে বিজিবি ও সেনবাহিনীর সাথে আপনাদের বিভিন্ন ব্যবসায়ীক সম্পৃক্ততা ছিল। ব্যাবসায়ীক সম্পৃক্ততার ব্যাপারে
আপনাদের বক্তব্য কি ?

আনিস আহমেদঃ
এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানােয়াট একটি প্রচারণা। আমার ভাই বিজিবি’র ডিজি থাকাকালীন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান হওয়ার পর আমি বা আমার কোন ভাই বিজিবি বা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কোন রকম ঠিকাদারী, সরবরাহকারী, কিংবা অন্য কোন অস্ত্র, গোলাবারুদ বা সরঞ্জাম সরবরাহ/বানিজ্য করি নাই। কেউ ঐ প্রতিষ্ঠানগুলাের সাথে ব্যবসা বানিজ্যে আমার সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে কোন প্রকার প্রমান দিতে পারলে যে কোন শাস্তি মাথা পেতে নেওয়ার মতো সৎ, সাহস আমার আছে।

প্রশ্নঃ কেন এই মিথ্যাচার বা অপপ্রচার? আপনার কি মনে হয় এতে রাজনৈতিক কোন আক্রোশ বা কোন স্বার্থান্বেসী মহলের ক্ষোভ আপনাদের উপর রয়েছে ?

আমাদের পরিবারের উপর বিএনপি জামায়াত এর রাজনৈতিক আক্রোশ

আনিস আহমেদঃ
আমরা সকলেই বাংলাদেশে বিএনপি-জামায়াতের হিংসাত্মক রাজনীতির ব্যাপারে জানি, যা আসলে আপনাদের নতুন করে বলার কিছু নেই। বিএনপি জামায়াত সরকার-২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের তৃণমূল ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে থাকা প্রায় ২৬ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করেছিল। মোস্তফা হত্যার বিতর্কিত মামলায় জড়িয়ে এফআইআর এবং চার্জশিট প্রমাণ করে যে এটি ছিল সাজানাে এবং মিথ্যা তথ্য প্রমাণের ঘাটতি বা তদন্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাবে বিচার বিভাগের রায় ভুল হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। আমেরিকার মতাে উন্নত দেশেও ২ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত ভুল বিচার হয়। একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে গত ২৫ বছরে ৩৪৯ জন নিরীহ মানুষকে ইনােসেন্ট প্রজেক্টের আওতায় কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে যারা মিথ্যা মামলায় জেলে ছিলেন। তবে দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশে এখনাে এমন কোনাে ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি যার মাধ্যমে এমন নিরীহ ব্যক্তি ন্যায়বিচার পাবে।

আমি বড় ভাই হিসেবে মােহাম্মদ হাসান ওরফে হারিস কে আল-জাজিরায় প্রচারিত সংবাদে যেভাবে কথা বলতে দেখেছি এরকম ভারসাম্যহীনভাবে কখনাে কথা বলতে আগে দেখি নাই। এর সত্যতা হিসাবে উক্ত সামি আল-জাজিরায় প্রচারিত সংবাদে মােহাম্মদ হাসান ওরফে হারিসকে সাইকোপ্যাথ বলে উপস্থাপন করেছে। একজন সাইকোপ্যাথের কথার উপর ভিত্তি করে কিভাবে আল-জাজিরা সংবাদ প্রচার করলাে? এটা সাংবাদিকতার কোন মানদন্ডে পড়ে? সাইকোপ্যাথ হিসেবে উপস্থাপন করার
পেছনের মূল রহস্য কি, তা আমরা খুজে বের করার চেষ্টা চালিয যাচ্ছি। মােহাম্মদ হাসান ওরফে হারিসের বন্ধুমহল ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মীরাও আল-জাজিরায় প্রচারিত তার সামগ্রীক কথাবার্তায় অবাক হয়েছেন। কারণ তিনি অত্যন্ত দায়িত্বশীল একজন মানুষ।

প্রশ্নঃ বিষয়টি অত্যন্ত হাস্যকর হলেও এড়িয়ে যেতে পারছি না, সংবাদ মাধ্যমে আপনার ভাই সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এর ছেলের অনুষ্ঠানে আপনাদের উপস্থিতিকে নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ঐ সময়ে আপনাদের পরিবারের কারাে নামে কোন মামলা বা চলমান মামলা ছিল কি?

আনিস আহমেদঃ অত্যন্ত হাস্যকর, আল-জাজিরায় প্রচারিত ডকুমেন্টারিটিতে বিষয়টিকে বিশেষভাবে উপস্থাপন করা হয় যে, আমরা দন্ডপ্রাপ্ত দুই ভাই আমি ও মােহাম্মদ হাসান ওরফে হারিস আমাদের ভাই জেনারেল আজিজ আহমেদ এর ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিতির ব্যাপারে। এমনকি মহামান্য রাষ্ট্রপতির সাথে স্থির চিত্র গুলােতে দন্ডপ্রাপ্ত আসামী হিসাবে আমাদের আখ্যায়িত করা হয়েছিল, তা আসলে সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। যখন আমরা উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম, তার পূবেই বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে দেওয়া মিথ্যা মামলার দন্ড থেকে রাষ্ট্র কর্তৃক আমাদের অব্যাহতি প্রদান। করা হয়েছিল। বর্তমানে আমাদের পরিবারের কোন সদস্যের বিরুদ্ধে কোন মামলা নেই।

একটি কুচক্রী মহল কথিত আল-জাজিরা টেলিভিশনের সাথে যােগ সাজস করে মিথ্যা ও বানােয়াট তথ্য দিয়ে আমাদের পরিবারকে পুনরায় ধ্বংস করার নীল নকশা করে আল-জাজিরা সংবাদ মাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রনােদিত প্রতিবেদন তৈরী করে অপপ্রচার করেছে, যা আমাদের পরিবারের জন্য চরম মানহানিকর। আল-জাজিরা প্রদর্শিত ভিডিও চিত্রে যে সকল তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়েছে, তা সম্পূর্ন মিথ্যা, বানােয়াট ও ভিত্তিহীন।

প্রশ্নঃ আল-জাজিরার অন্যতম চরিত্র সামি। সামির পরিচয় ও সামির সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠার ব্যাপারে কিছু বলুন।

সামির পরিচয় ও সম্পৃক্ততা

আনিস আহমেদঃ প্রদর্শিত ভিডিও চিত্রে আল-জাজিরার প্রধান চরিত্রের আসল নাম তানভীর মােহাম্মদ সাদাত খান পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করে তিনি হন সামিউল ইসলাম খান এবং বর্তমানে তিনি জুলকার নাঈম সাইয়ের খান ওরফে সামিউল ইসলাম হিসাবে পরিচিত; যাকে আল-জাজিরা ভিডিওতে সামি হিসাবে উপস্থাপন করেছে। ইতিমধ্যে আপনারা সামির পরিচয় গােপনীয়তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে এবং তার বেআইনি কার্যকলাপের তথ্য বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে পেয়েছেন।

প্রদর্শিত ভিডিও চিত্রে সামি দাবি করেছেন, বিজিবির প্রধান থাকা অবস্থায় আমার মেজো ভাই জেনারেল আজিজ আহমেদ হাঙ্গেরী সফরকালীন সময়ে সামির সাথে দেখা করে আমার সেজো ভাই মােহাম্মদ হাসান ওরফে হারিসকে ব্যবসায়িকভাবে সহযােগীতা করার জন্য অনুরোধ করেন। আমার মেজো ভাই জেনারেল আজিজ আহমেদ এর সাথে সামি অর সময়ের সৌজন্যমূলক স্বাক্ষাতে বাংলাদেশী বংশতভূত একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হিসাবে পরিচয় দিয়ে তার কাছ থেকে বিভিন্ন রকমের
পরিকল্পিত উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য আমার সেজো ভাই মােহাম্মদ হাসান ওরফে হারিসের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়। আল-জাজিরার এজেন্ট হয় সামি বিভিন্ন ব্যবসার প্রলােভন দেখিয়ে মােহাম্মদ হাসান ওরকে হারিসের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে যায় এবং বিভিন্ন পাটি ও অনুষ্ঠানে তাকে দাওয়াত করে।

প্রশ্নঃ আহমেদ পরিবারকে জড়িয়ে আল-জাজিরার করা ডকুমেন্টারির বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আমরা জানলাম। তাে সবশেষে সার্বিক ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কি?

সমাপনী বক্তব্য ও নিন্দা জ্ঞাপন

আনিস আহমেদঃ
আল-জাজিরায় প্রকাশিত উদ্দেশ্যপ্রনােদিত একটি সাজানাে, মিথ্যা, বানােয়াট ও বিভ্রান্তিকর
পরিবেশনা। একটি স্বার্থান্বেশী মহলের রাজনৈতিক এবং ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের জন্যই একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারকে জড়িয়ে এ ধরনের
মিথ্যা কালিমা লেপন অত্যন্ত ঘৃণ্য ও নেক্কারজনক কাজ। আমার ভাই সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ও মাননীয়
প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এবং আমাদের সম্ভ্রান্ত পরিবারকে জড়িয়ে আল-জাজিরার প্রতিবেদনে খুনি মাফিয়া হিসেবে অপপ্রচারকে আমি ঘৃণাভবে প্রত্যাখ্যান করছি এবং তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছি। স্বার্থান্বেশী মহলের জ্ঞাতার্থে বলতে চাই – আমি এবং আমার ভাই মােহাম্মদ হাসান ও জোসেফ এর নামে কোথাও কোন মামলা নেই এবং আমরা কোন পলাতক আসামীও নই। সুস্পষ্টভাবে অপপ্রচারকারীদের উদ্দেশ্যে আরও বলতে চাই – আমি বা আমার ভাই মােহাম্মদ হাসান কিংবা জোসেফ কোন
মামলায় ফেরারী আসামী কিংবা ইন্টারপােলের ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল ও নই। আল-জাজিরায় প্রকাশিত এ ধরনের মিথ্যাচার ও অপপ্রচারকে আমি, আমার পরিবারের পক্ষ হতে প্রত্যাখ্যান করছি। আমি আর বক্তব্য দীর্ঘায়িত না করে এখানেই শেষ করছি। কি উদ্দেশ্যে? কি কারণে? All The Prime Minister Men প্রচারিত হয়েছে তার বিচারের ভার আপনাদের হাতে তুলে দিলাম।